এই লেখায় যা আছে
২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্ব বাজারে দুটি বড় ঘোষণা আসে। টেক জায়ান্ট আইবিএম (IBM)-এর দায়িত্ব নেন অরবিন্দ কৃষ্ণা Reuters, 2020, এবং পরবর্তীতে গ্লোবাল জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাটা (Bata)-র সিইও হিসেবে যুক্ত হন সন্দীপ কাটারিয়া। এই ঘোষণাগুলোতে করপোরেট বিশ্ব খুব একটা বিস্মিত হয়নি — কারণ গত এক দশকে বিশ্বের সেরা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শীর্ষ পদে ভারতীয়দের আরোহণ প্রায় নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু কেন বিশ্বজুড়ে এককভাবে ভারতীয় পেশাদারদের এই জয়জয়কার? এটি কি নিছক কাকতালীয় ঘটনা, নাকি এর পেছনে নির্দিষ্ট কিছু অনুঘটক কাজ করছে?
পোশাক রপ্তানিতে হয়তো কোনো দেশ শীর্ষে থাকতে পারে, কেউ দক্ষ শ্রমিক বা ফুটবলার রপ্তানিতে সেরা হতে পারে। তবে ভারত এমন এক দেশ, যা বিশ্বের টেক ও কর্পোরেট জগতে "সিইও রপ্তানির হাব" হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। গুগল, মাইক্রোসফট, বাটা, মাস্টারকার্ড, নোকিয়া, নেটঅ্যাপ, পেপসিকো কিংবা আইবিএম — সব বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের শীর্ষ পদে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন ভারতীয় নাগরিকরা।
বিশ্বমঞ্চে সাফল্যের ৬টি বড় কারণ
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও নেতৃত্বের বিকাশ
গুগলের প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন এবং ল্যারি পেজ যখন অ্যালফাবেটের দায়িত্ব সুন্দর পিচাইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর কারিগরি যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যাকগ্রাউন্ডকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সুন্দর পিচাই ভারতের খড়গপুর আইআইটি (IIT) থেকে পড়াশোনা শেষ করে আমেরিকায় যান। ভারতের মতো বহুসংস্কৃতি, বহু ধর্ম ও বৈচিত্র্যময় জনবহুল দেশে বেড়ে ওঠার কারণে বিভিন্ন ধরনের মানুষের মানসিকতা বোঝার এক অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে। গুগল বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে থাকা অফিসে ১৬০টিরও বেশি দেশের নাগরিক নিয়ে কাজ করে — এমন এক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য সামলাতে সুন্দর পিচাইয়ের এই অভিযোজন ক্ষমতা বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিকূলতায় মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা (Adaptability)
মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলার কথাই ধরা যাক। তেলেঙ্গানার এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে আইআইটিতে সুযোগ না পেয়ে তিনি মণিপাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন। পরবর্তীতে আমেরিকায় এসে একদম ভিন্ন সংস্কৃতিতে মানিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে শীর্ষে পৌঁছান। যেকোনো প্রতিকূল ও ভিন্ন পরিবেশে গিয়ে মানিয়ে নেওয়া এবং সাফল্যের সাথে ফোকাস ধরে রাখার এই গুণটিকে আমেরিকান বা ইউরোপীয় বোর্ড মেম্বাররা নেতৃত্বের বড় মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত মনোভাব (Corporate Loyalty)
সিলিকন ভ্যালিতে ভারতীয়দের নিয়ে আরেকটি ইতিবাচক ধারণা রয়েছে — কাজের প্রতি তাঁদের আনুগত্য। অ্যাডোবির সিইও শান্তনু নারায়েন ১৯৯৮ সালে যখন পদোন্নতি পান, তখন অন্য অনেক নামী কোম্পানি তাঁকে দেড়গুণ বেশি বেতনের অফার দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে অ্যাডোবিতেই নিজের অবস্থান শক্ত করেন। এই আনুগত্যের মূল্যায়ন করে প্রতিষ্ঠানটি ২০০৭ সালে তাঁকে সিইও পদে ভূষিত করে।
সাবলীল যোগাযোগ দক্ষতা (Communication Skills)
চীন, জাপান, জার্মানি বা ফ্রান্সের মানুষের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বিশ্ব ব্যবসার প্রধান মাধ্যম ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেকেই পিছিয়ে পড়েন EF EPI। অন্যদিকে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় খুব অল্প বয়স থেকেই ইংরেজির ওপর জোর দেওয়া হয়। ফলে বৈশ্বিক বোর্ডরুম বা মিটিংয়ে তারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের ভিশন ও পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারেন।
মেধা ছাঁকনির কারখানা: আইআইটি (IIT)
ভারতীয় প্রযুক্তি বিপ্লবের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT)। দিল্লি, মুম্বাই, খড়গপুর বা কানপুর আইআইটি থেকে প্রতি বছর বিশ্বের অন্যতম সেরা মেধার জন্ম হয়। আইআইটির ভর্তি পরীক্ষা এতটাই প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও অ্যানালিটিক্যাল যে এখানে মুখস্থবিদ্যার কোনো সুযোগ নেই। প্রতি বছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্য থেকে কঠোর ছাঁকনি প্রক্রিয়ার পর মাত্র কয়েক হাজার সেরা মেধা সুযোগ পায় — এই পরিবেশ তরুণদের মনে ছোটবেলা থেকেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার মানসিকতা গেঁথে দেয়।
বিশাল কনজিউমার মার্কেট ও ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার World Bank। তাই ভারতীয় প্রেক্ষাপট জানা একজন নির্বাহী যেমন এশিয়ার বাজার ভালোভাবে বুঝতে পারেন, তেমনি সংকটময় মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত দক্ষ হন। যেমন — উইওয়ার্ক (WeWork)-এর বিশাল সংকটের সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত সন্দীপ মাথরানির ওপর আস্থা রাখা হয়েছিল।
শুধু মেধা নয়,
সঠিক পরিবেশ,
যোগাযোগ দক্ষতা,
এবং নেতৃত্বই একজন মানুষকে
বিশ্বমানের CEO বানায়।
বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে এবং আমাদের শিক্ষাভাবনা
ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক এই করপোরেট প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো —
- শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতা ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব — সাধারণ, ইংরেজি মাধ্যম, ক্যাডেট, মাদ্রাসা—এমন নানা ধারার শিক্ষাব্যবস্থা থাকলেও আমাদের পড়াশোনায় অ্যানালিটিক্যাল স্কিল ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের মারাত্মক অভাব রয়েছে।
- গবেষণা ও বাজেটের সংকট — দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে সবচেয়ে কম বাজেট বরাদ্দ রাখা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে UNESCO।
- রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অনিয়ম — বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশের গবেষণাবিমুখতা এবং শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির প্রভাবেই মানসম্মত শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
- মানসিকতার সীমাবদ্ধতা — আমাদের দেশে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল একটি নিরাপদ চাকরি পাওয়া। নতুন কিছু শেখা বা সীমানা পেরিয়ে নিজেকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ কম।
প্রত্যাশা
আমাদের তরুণদের মেধা কম নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বহুমাত্রিক চিন্তাভাবনার সুযোগ এবং বিশ্বমানের যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করতে পারলে একদিন হয়তো গুগল, মেটা বা মাইক্রোসফটের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে থাকা সবুজ পাসপোর্টধারী কোনো বাংলাদেশি তরুণকেও আমরা দেখতে পাব।
মেধা আমাদের আছে — এখন দরকার সঠিক পরিবেশ, সাহস আর বিশ্বমানের প্রস্তুতি।
লিখেছেন: Masum
📚 রেফারেন্স ও সোর্স
নিচের সোর্সগুলো সাধারণ যাচাইয়ের জন্য দেওয়া হলো — নির্দিষ্ট দাবির সঠিক তথ্য/পরিসংখ্যানের জন্য সংশ্লিষ্ট সোর্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন দেখুন।
