← সব আর্টিকেলে ফিরে যান

Content note: এই লেখায় মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, শোষণ ও নির্যাতনের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

Human Rights · Investigation

ডিজিটাল যুগের ক্রীতদাস প্রথা: কুয়েতের গৃহকর্মী ও কাফালা সিস্টেমের ভেতরের গল্প

স্মার্টফোনের অ্যাপ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ কেনাবেচা—শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি নথিভুক্ত বাস্তবতা। কাফালা সিস্টেম, পাসপোর্ট জব্দ আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গৃহকর্মী শোষণের প্রামাণ্য চিত্র।

Human Rights / Investigation·১৪ মিনিট পড়ার সময়

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মানুষ কেনাবেচা হয়—শুনতে অবাক লাগলেও এটি সত্যি। ইতিহাসের পুরনো ক্রীতদাস বাজারগুলো বন্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সভ্যতার গায়ে সেই ক্ষতচিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে যায়নি—তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তা নতুন রূপ নিয়েছে। এখন হয়তো খোলা বাজারে মানুষ ধরে আনা হয় না, কিন্তু বিভিন্ন উপায়ে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে বাধ্য করা হয় শোষণমূলক পরিস্থিতিতে কাজ করতে।

পারস্য উপসাগর তীরবর্তী তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশ কুয়েতে গৃহকর্মী নিয়োগের হার সবচেয়ে বেশি বলে জানা যায়।

~৯০%
দাবিকৃত পরিসংখ্যান
Source: Global Citizen, BBC investigation (2019)

২০১৯ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী কুয়েতের প্রায় ৯০% (১০টির মধ্যে ৯টি) বাড়িতে গৃহকর্মীর উপস্থিতি আছে বলে দাবি করা হয়েছে। এটি কোনো সরকারি আদমশুমারি তথ্য নয়—একটি সাংবাদিকতা অনুসন্ধানের উদ্ধৃত পরিসংখ্যান, তাই এটিকে সেভাবেই বিবেচনা করা উচিত।

প্রতি কতজন নাগরিকের জন্য কতজন গৃহকর্মী বরাদ্দ থাকে—এই নির্দিষ্ট অনুপাতের কোনো নির্ভরযোগ্য সোর্স পাওয়া যায়নি। [SOURCE NEEDED]

যেভাবে ডিজিটাল বাজারে পরিণত হলো মানুষ

২০১৯ সালে BBC News Arabic-এর একটি undercover অনুসন্ধানে উঠে আসে, কুয়েত ও সৌদি আরবে ইনস্টাগ্রাম, Facebook এবং 4Sale ও Haraj-এর মতো marketplace অ্যাপের মাধ্যমে গৃহকর্মী কেনাবেচার একটি সক্রিয় বাজার চলছে। বিক্রির পোস্টে ব্যবহৃত হ্যাশট্যাগের মধ্যে ছিল "মেইড ফর ট্রান্সফার" ও "মেইড ফর সেল"।
Source: BBC News — "Maids for sale: How Silicon Valley enables online slave markets" (2019)

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪Sale অ্যাপে জাতি অনুযায়ী নারীদের ক্যাটাগরি করে দাম নির্ধারণ করা হতো। একজন গৃহকর্মীকে প্রায় ৬০০ কুয়েতি দিনার (আনুমানিক $2,000)-এ কেনা এবং পরবর্তীতে প্রায় ১,০০০ দিনার ($3,300)-এ পুনরায় বিক্রি করার নজিরও পেয়েছিলেন BBC-এর সাংবাদিকরা।
Source: BBC News (2019)

বিক্রেতারা প্রায় সবাই ক্রেতাদের পরামর্শ দিতেন—গৃহকর্মীর পাসপোর্ট জব্দ করতে, বাড়ির বাইরে যেতে না দিতে, ছুটি না দিতে এবং ফোনে প্রবেশাধিকার সীমিত রাখতে।

Source: BBC News Arabic undercover investigation, 2019 (উপরের তালিকা)।

"What they are doing is promoting an online slave market." — Urmila Bhoola, তৎকালীন জাতিসংঘের Special Rapporteur on Contemporary Forms of Slavery, BBC-কে দেওয়া বিবৃতিতে (২০১৯)। Source: BBC News, 2019

মানুষ কোনো পণ্য নয়। একজন মানুষের শ্রম, স্বাধীনতা ও মর্যাদা কেনাবেচার বস্তু হতে পারে না।

একটি নথিভুক্ত ঘটনা: ষোলো বছরের একটি মেয়ে

BBC-এর ওই অনুসন্ধানে সাংবাদিকরা গিনি থেকে আসা ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর সন্ধান পান, যাকে তার নিয়োগকর্তা প্রায় $3,800-এ বিক্রির জন্য একটি অ্যাপে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে তার পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম "Fatou" ব্যবহার করা হয়। BBC-এর হস্তক্ষেপের পর তাকে উদ্ধার করে গিনিতে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, এবং কুয়েতের কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্তের ঘোষণা দেয়।
Source: The Business Standard, ২০১৯ (BBC-এর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে)

এই ঘটনাটি একটি সুনির্দিষ্ট, সাংবাদিকতার মাধ্যমে নথিভুক্ত ও পরবর্তীতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া case—এটিকে প্রতিটি গৃহকর্মীর সাধারণ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং এই বাজার-ব্যবস্থার একটি চরম ও নথিভুক্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা উচিত।

বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নথিতে ২১-২২ বছর দেখানো হয় বলে যে দাবি ছড়িয়ে আছে, তার জন্য স্বতন্ত্র, নির্ভরযোগ্য সোর্স যাচাই করা যায়নি। [SOURCE NEEDED]

কাফালা সিস্টেম কী?

কাফালা সিস্টেম উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি স্পনসরশিপ-ভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ কাঠামো, যেখানে একজন অভিবাসী গৃহকর্মীর আইনি অবস্থান তার নিয়োগকর্তা/স্পনসরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। এই কাঠামোয় নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া চাকরি বদল বা দেশত্যাগ সাধারণত সম্ভব হয় না, যা গৃহকর্মীদের নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ফেলে।

Sponsor / নিয়োগকর্তা
গৃহকর্মী
Employment Control
Mobility Restrictions

এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগের সময় নিয়োগকর্তা একটি নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে স্পনসর হিসেবে নিবন্ধিত হন। এরপর সেই গৃহকর্মী তাঁর স্পনসরের অনুমতি ছাড়া নিয়োগকর্তা পরিবর্তন বা কাজ ছেড়ে যেতে পারেন না। কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা নিজেদের মধ্যেই গৃহকর্মীর স্পনসরশিপ হস্তান্তর বা বিক্রি করেন—যদিও এটি কোনো আইনি ব্যবস্থা নয়, একজন মানুষের "সেবা" পাওয়ার অধিকার কেনা যেতে পারে না, মানুষকে নিজেকে কখনোই কেনা যায় না।

আইনি ও মানবাধিকার প্রেক্ষাপট

যখন ন্যায়বিচার চাওয়াই হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, কাফালা সিস্টেম-এর অধীনে থাকা গৃহকর্মীরা প্রায়ই নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে ভয় পান, কারণ নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করাকে "পলায়ন" হিসেবে গণ্য করে আটক, জরিমানা এমনকি দেশত্যাগে বাধ্য করা হতে পারে।

নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় আত্মসমর্পণ করার পর কারাদণ্ড ভোগ করে পরিবারে ফেরার যে ব্যক্তিগত ঘটনা মূল খসড়ায় উল্লেখ ছিল, তার জন্য কোনো স্বতন্ত্র, যাচাইযোগ্য সোর্স পাওয়া যায়নি। এই নির্দিষ্ট ঘটনাটিকে verified fact হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। [SOURCE NEEDED] সার্বিকভাবে "পলায়নকারী" গৃহকর্মীদের আটক ও শাস্তির কাঠামোগত ঝুঁকি অবশ্য উপরে উল্লিখিত U.S. State Department TIP রিপোর্টে নথিভুক্ত আছে।

মানুষ কোনো পণ্য নয়

প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু শোষণের পুরনো কাঠামো নতুন মোড়কে টিকে থাকতে পারে—কখনও একটি অ্যাপের মাধ্যমে, কখনও একটি স্পনসরশিপ কাগজে। মানুষের শ্রম কেনা যায়, কিন্তু মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কখনোই বেচাকেনার বস্তু হতে পারে না। আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা ছাড়া এই ব্যবস্থার আসল সংস্কার সম্ভব নয়।

Sources & Further Reading

← সব আর্টিকেলে ফিরে যান