আজকের বিশ্বপরিস্থিতির দিকে যদি আমরা গভীরভাবে নজর দিই, তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সমাজের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত এবং বাংলাদেশের মুসলমানদের শিক্ষা, পেশা ও মানসিকতার দিকে তাকালে এক হতাশাজনক চিত্র দেখা যায়।
১. ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রবাসী মুসলমানদের বাস্তব চিত্র
আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং আফ্রিকা, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, পাকিস্তানসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব থেকে অসংখ্য মানুষ প্রবাসী হিসেবে বসবাস করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারা সেখানে সমাজের কোন পর্যায়ে বা কোন পেশায় নিয়োজিত আছেন?
বাস্তবতা হলো, এদের একটি বড় অংশ ট্যাক্সি ড্রাইভার, রেস্তোরাঁর ওয়েটার, কেয়ার হোম কর্মী কিংবা রাইড শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারির মতো নিম্ন বা মধ্যম সারির পেশায় যুক্ত। বিপরীতে, চাইনিজ বা ইহুদি সম্প্রদায়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চশিক্ষা অর্জন করে গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি খাত, আইনি ব্যবস্থা ও নীতি-নির্ধারণী উচ্চপদস্থ অবস্থানে কাজ করছেন[3]।
আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ ভিসা সেন্টারগুলোতে লাইন দিচ্ছে। কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য কী? উচ্চশিক্ষা অর্জন করে কোনো উদ্ভাবনী পেশায় যাওয়া, নাকি যেকোনো উপায়ে বাপের জমি বিক্রি করে হলেও ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে একটি রেস্তোরাঁ বা কেয়ার হোমের চাকরি জোগাড় করা?
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (UNHCR) তথ্যমতে, প্রতি বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে বা উপকূলরক্ষীদের হাতে উদ্ধার হয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে[1][2]। পরবর্তীতে কয়েক বছর চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবন পার করে তারা ঐসব দেশের নিম্নস্তরের কাজে বাধ্য হচ্ছে। এটি পুরো মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও সক্ষমতার এক করুণ বাস্তবতার ছবি।
২. মধ্যপ্রাচ্য ও জ্ঞানচর্চার বিমুখতা
আল্লাহ তাআলা মধ্যপ্রাচ্যের আরব বিশ্বকে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষা, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবে সেই অর্থ ব্যয় না করে একটি বড় অংশ ব্যয় করা হচ্ছে পর্যটন, তারকা খেলোয়াড় ও বিনোদন খাতের পেছনে।
যেখানে তাদের পাশেই ফিলিস্তিনের গাজায় চরম মানবিক বিপর্যয় ঘটছে এবং সাধারণ মানুষ খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার অভাবে হাহাকার করছে — সেখানে এই অঢেল সম্পদের সঠিক ব্যবহার শিক্ষামূলক ও কূটনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারত। মূল কারণ হলো, কৌশলগত জ্ঞান ও দূরদর্শিতার অভাব।
৩. শিক্ষাহীনতা ও অপরাধের প্রবণতা
শিক্ষা ও নৈতিকতার অভাব ঘটলে একটি সমাজ কীভাবে পিছিয়ে পড়ে, তা বিভিন্ন দেশের অপরাধের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। দারিদ্র্য ও সুশিক্ষার অভাবে তরুণ সমাজ জুয়া, মাদক ও অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যখন একটি জাতি জ্ঞান ও সুশিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়, তখন তারা খুব সহজেই অন্যদের দাসত্ব বা অপব্যবহারের শিকার হয়। সুশিক্ষিত মানুষকে সহজে বশে আনা যায় না, কিন্তু শিক্ষাহীন মানুষকে অল্প প্রলোভনে পথভ্রষ্ট করা সহজ।
৪. বাংলাদেশের শিক্ষার মান ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থায় জ্ঞানের চেয়ে বিনোদন বা ক্ষণিকের উত্তেজনার গুরুত্ব বেশি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা হয়, সেখানে আমাদের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ অনুকরণপ্রিয় মানসিকতায় সময় পার করছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও আমাদের অবস্থান মূলত সস্তা শ্রমের ওপর টিকে আছে।
গার্মেন্টস শিল্প: আমরা তৈরি পোশাক রপ্তানি করে গর্ব করি, কিন্তু এটি মনে রাখা জরুরি — এটি কোনো উচ্চপ্রযুক্তির উদ্ভাবন নয়, বরং সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংক ও ILO-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ টিকিয়ে রেখেছে মূলত তাদের কম মজুরির শ্রমিকরা[6][4]।
প্রবাসী শ্রম: মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভারতীয় বা অন্যান্য দেশের প্রবাসীরা যেখানে ব্যবস্থাপনা (Management) পর্যায়ে কাজ করছেন, সেখানে আমাদের প্রবাসী ভাইদের বেশিরভাগই কঠিন কায়িক শ্রমে যুক্ত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে দক্ষ (Skilled) শ্রমিকের অনুপাতে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলক পিছিয়ে[4][5]।
আমাদের করণীয়
জ্ঞান ও সুশিক্ষাই হলো যেকোনো জাতির উন্নতির মূল চাবিকাঠি। ইতিহাস বলে, মুসলমানরা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও চিন্তাচর্চায় বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছিল (যেমন: ইসলামী স্বর্ণযুগ), তখনই তারা বিজয়ী ও সম্মানিত হয়েছিল।
বরং আমাদের সন্তান ও তরুণ প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষ হতে হবে এবং আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন নাগরিকে পরিণত হতে হবে।
তথ্যসূত্র
ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের সময় ঘটে যাওয়া মৃত্যু, উদ্ধার ও আশ্রয়প্রার্থীদের পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করে।
উৎস দেখুন ↗অনিয়মিত অভিবাসনপথে ঘটে যাওয়া মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত করে থাকে, বিশেষত ভূমধ্যসাগরীয় রুটে।
উৎস দেখুন ↗যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শিক্ষাগত অর্জন ও পেশাগত অবস্থান নিয়ে জরিপভিত্তিক গবেষণা প্রকাশ করে।
উৎস দেখুন ↗বৈশ্বিক শ্রমবাজার, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতার শ্রেণিবিন্যাস ও মজুরি সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
উৎস দেখুন ↗বিদেশগামী বাংলাদেশি শ্রমিকদের দক্ষতার শ্রেণি (দক্ষ/আধা-দক্ষ/অদক্ষ) অনুযায়ী সরকারি পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করে।
উৎস দেখুন ↗বাংলাদেশের অর্থনীতি, রপ্তানি খাত ও শ্রমবাজার সংক্রান্ত পরিসংখ্যান ও নীতি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে।
উৎস দেখুন ↗বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি, উৎপাদন খরচ ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে।
উৎস দেখুন ↗